মিঠামইন ভূমি অফিসে ফাইল গায়েবের অভিযোগ বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশও অগ্রাহ্য
মিঠামইন প্রতিনিধি।
সরকার ভূমি সেবা ডিজিটাল করে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বললেও কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা মিঠামইনে চিত্রটা পুরো উল্টো। অভিযোগ উঠেছে,উপজেলা ভূমি অফিসে সেবা নিতে গেলে হয়রানি আর অতিরিক্ত টাকা ছাড়া কোনো ফাইলই নড়ে না।স্থানীয়দের অভিযোগ নামজারি-খারিজ,ডিসিআর,মিসকেসসহ সব সেবার জন্য অনলাইনে আবেদন ও হার্ডকপি জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও অফিসে ঢুকলেই কর্মচারী চক্র ঘিরে ধরে। ডিসিআর ফি সরকারি ভাবে মাত্র ১১৫০ টাকা হলেও ঘুষ ছাড়া আবেদনপত্র "হারিয়ে যায়" "ফাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না","আজ হবে কাল হবে" বলে মাসের পর মাস ঘোরানো হয়।অথচ চাহিদামতো টাকা দিলে একই কাজ চোখের পলকে হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
মুক্তিযোদ্ধাও হয়রানির শিকার সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন আহমেদের ঘটনা।তিনি এক বছর আগে বিভাগীয় কমিশনের বরাবর প্রতিকার চেয়ে লিখিত আবেদন করেন এর প্রেক্ষিতে বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশে শিক্ষা ও আইসিটি শাখা থেকে গত ২৮ শে অক্টোবর ২০২৫ ইং ২ তারিখে মিঠামনই উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে পাঠানো হয়।সেখান থেকে আবার মিঠামইন উপজেলা ভূমি অফিসে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য পাঠানো হয়।কিন্তু কে শুনে কার কথা।অফিসের সবাই নিজেদের ব্যক্তিগত কাজ নিয়েই যেন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।ফলে বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশও ফাইল বন্দী হয়ে থাকার মতন ঘটনা ঘটছে এখানে।
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এই প্রতিবেদকে জানান ১০ মাস ধরে বহুবার অফিসে এসেছি,অথচ কোনো ফল পাইনি।এখন বলা হচ্ছে বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশ পত্রটিই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের মতো সচেতন মানুষ,উচ্চ মহলের নির্দেশ নিয়েও যদি হয়রানির শিকার হই,তাহলে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা একবার ভাবুন" বলেন তিনি।তার অভিযোগ, ঘুষ না দিলে ফাইলই খুঁজে পায় না অফিসের লোকজন।
ভূমি অফিসের আশপাশে গেলে শোনা যায়, ঘুষ না দিলে ফাইল টেবিলে পড়ে থেকে একসময় গায়েব করে ফেলা হয়। অফিস সহকারীরা অজুহাত হিসেবে বলেন সার্ভেয়ার আবুল খায়ের রোজার মাসে হঠাৎ ঢাকায় বদলি হয়ে যাওয়ায় কাজকর্ম ঠিকমতো হচ্ছে না। তিনি ফাইল কোথায় রেখে গেছেন তাও জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে সার্ভেয়ার আবুল খায়েরের বিরুদ্ধেও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।খারিজ ও মিসকেস নিয়ে আসা সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ।
সাংবাদিক মুক্তার হোসেন গোলাপ জানান ভূমি অফিসে তার একটি মিসকিসের আবেদন ঝুলে আছে বহুদিন ধরে।গত বছরের ৭ ই অক্টোবর দাবির ভূমির অংশ পৃথকীকরণ করার জন্য আবেদন করা হলে ৮৮(১৩)২৫-২৬মোকদ্দমা রুজু হয় ।এর পরিপ্রেক্ষিতে ইউনিয়ন ভূমিক কর্মকর্তা গোলাপের দাবির পক্ষে উপজেলা ভূমি অফিসে মতামত প্রেরণ করার পর বিষয়টি ফাইল বন্দি হয়ে পড়ে রয়েছে।
গত ২১/১০/২০২৫ তারিখে আওয়াল মিয়া সহকারী কমিশনারের বরাবর ৮৭৬ (৯-১) ২০২৩-২০২৪ নং নামজারি জমাখারিজটি রিভিউ করে আংশিক সংশোধন করে কর্তনকৃত ভূমি মূল খতিয়ানে ফেরত আনার আবেদন করেন। কিন্তু কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি এখনো কোনো প্রতিকার পাননি।এ বিষয়ে জানতে উপজেলা ভূমি অফিসে গেলে সহকারী কমিশনারকে পাওয়া যায়নি। বর্তমানে এর দায়িত্বে আছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন "আমি এ ধরনের অভিযোগ পাইনি। যদি এ ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকে তাহলে খুবই দুঃখজনক। আমার অফিসে ঘুষ ও হয়রানির কোনো প্রশ্নই আসে না। কারো বিরুদ্ধে ঘুষের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বলেন মিঠামইনে সব নিয়ম কাগজেই সীমাবদ্ধ। হয়রানি আর অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কারণে মানুষ ভূমি অফিসমুখী হতেই ভয় পাচ্ছে।ভূমি মন্ত্রণালয় ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করার কথা বললেও মিঠামইনের বাস্তবতা ভিন্ন। বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশ অমান্য করে একজন মুক্তিযোদ্ধা পর্যন্ত হয়রানির শিকার হলে সাধারণ মানুষের ভরসা কোথায়, সেই প্রশ্নই এখন হাওরবাসীর।
আপনার মতামত লিখুন