লক্ষ্মীপুরের মেয়ে হোমায়রা হিমু,তিন বছরেও কাটেনি মৃত্যু রহস্য
ফয়সাল হোসেন লক্ষ্মীপুর।
টেলিভিশনের পর্দায় তার অভিনয় দেখেছেন অসংখ্য দর্শক। নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় সংলাপ বলে পেয়েছিলেন আলাদা পরিচিতি। তবে তার অভিনয়জীবনের শুরুটা হয়েছিল লক্ষ্মীপুরে। এই শহরেই কেটেছে শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় সময়। স্থানীয় নাট্যগোষ্ঠীর মঞ্চে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল তার পথচলা। তিনি অভিনেত্রী হোমায়রা হিমু।
২০২৩ ইং সালের ২ রা নভেম্বর আকস্মিক মৃত্যু হয় এই অভিনেত্রীর। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে তিন বছর।কিন্তু তার মৃত্যুর কারণ ও ঘটনা প্রবাহ নিয়ে উঠা প্রশ্নগুলোর পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি হয়নি। অভিনয়ের মধ্য দিয়ে দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়া হিমুর মৃত্যুর বিচার চান স্বজন ও স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা।
১৯৮৫ ইং সালের ২৩ রা নভেম্বর লক্ষ্মীপুরে জন্ম হোমায়রা হিমুর।শৈশবের বড় একটি সময় কেটেছে এই শহরেই।দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে মঞ্চনাটকে অভিনয় শুরু করেন তিনি।যুক্ত ছিলেন স্থানীয় হাইফাই কৌতুক শিল্পগোষ্ঠী ও ফ্রেন্ডস নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে।১৯৯৯ ইং সালে এসএসসি পরীক্ষার পর ঢাকায় গিয়ে যুক্ত হন নাগরিক নাট্যাঙ্গনে।সেখান থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তার অভিনয়জীবন।
লক্ষ্মীপুরে হোমায়রা হিমুর অভিনয়ের শুরুর দিনগুলোর স্মৃতি এখনো মনে রেখেছেন স্থানীয় নাট্যকর্মীরা। হাইফাই ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংসদের সাবেক পরিচালক মহসিন কবির বলেন প্রথম দিকে হিমু তার মায়ের সঙ্গে হাইফাইয়ে আসতেন।একদিন মঞ্চে অভিনয়ের আগে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রয়াত বেলায়েত হোসেন রিপন তাকে পুরোনো জামা পরার বিষয়টি নিয়ে ধমক দিয়েছিলেন। এতে কেঁদে ফেলেন হিমু।মহসিন কবিরের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, সেই মুহূর্তের অভিনয় দর্শকদের বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মাহবুবুর রহমান জানান মঞ্চে প্রথম দ্বৈত অভিনয়টি তার সঙ্গেই করেছিলেন হোমায়রা হিমু।ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি তার আগ্রহ ছিল।অল্প বয়সে এমন প্রতিভাবান একজন শিল্পীর চলে যাওয়া তাকে ব্যথিত করে।হোমায়রা হিমুর শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে লক্ষ্মীপুরের যে বাড়িতে,সেখানে এখনো তাঁকে স্মরণ করেন স্বজন ও পরিচিতজনেরা।মা-বাবাকে হারিয়ে জীবনের শেষ দিকে ঢাকায় অনেকটা একাকী জীবন কাটিয়েছেন তিনি।মৃত্যুর পর তাকে লক্ষ্মীপুর শহরের লামচরী মসজিদ কবরস্থানে তার মায়ের পাশে সমাহিত করা হয়।যে শহরে তার অভিনয়জীবনের সূচনা, মৃত্যুর পর সেখানেই মায়ের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তিনি।
হিমুর দূরসম্পর্কের মামা ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক মঈন উদ্দিন চৌধুরী কামরু বলেন এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।পাশাপাশি হিমুর এক ফুফাকেও বিষয়টি নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। তিনি চান, ঘটনার যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসুক এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক।
২০২৩ ইং সালের ২ রা নভেম্বর রাজধানীর উত্তরার একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা হোমায়রা হিমুকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর পর তার মরদেহ হাসপাতালে রেখে এক ব্যক্তির চলে যাওয়ার ঘটনা তখন নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।শুরুতে তার মৃত্যুর কারণ নিয়েও তৈরি হয় ধোঁয়াশা।পরদিন এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে একজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
তিন বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।তারা চান মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা হোক।লক্ষ্মীপুরের মঞ্চ থেকে শুরু হয়েছিল হোমায়রা হিমুর অভিনয়ের পথচলা। সেই পথ তাকে নিয়ে গিয়েছিল টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের পর্দায়।দর্শকের কাছে তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন অভিনয় দিয়ে।কিন্তু অকালমৃত্যুতে থেমে গেছে সেই পথচলা। মায়ের পাশে লক্ষ্মীপুরের মাটিতে শায়িত এই অভিনেত্রীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন তার স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
আপনার মতামত লিখুন