সাংবাদিকতা,সত্য অনুসন্ধান,জনস্বার্থ ও সমাজ পরিবর্তনের এক শক্তিশালী মাধ্যম
রফিকুল ইসলাম রফিক,সুনামগঞ্জ।
সাংবাদিকতা শুধু সংবাদ সংগ্রহ, লেখা কিংবা প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি মহান পেশা, সামাজিক দায়িত্ব এবং জনস্বার্থ রক্ষার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম।সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা, অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করা, রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সাংবাদিকতা।
সাংবাদিকতা কী?
সাংবাদিকতা হলো সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, অপরাধ, মানবাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই, বিশ্লেষণ এবং তা গণমাধ্যমের মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া।একজন সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব হলো সত্য অনুসন্ধান করা এবং সেই সত্য মানুষের সামনে তুলে ধরা। তিনি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কথা শোনেন, ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন,তথ্য-উপাত্ত যাচাই করেন এবং জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করেন।
সাংবাদিকতা কেন প্রয়োজন?
একটি সভ্য, সচেতন ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে সাংবাদিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ, জনগণকে সঠিক তথ্য জানানো এবং রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন করাই সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
সাংবাদিকতা প্রয়োজন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণেঃ—
১. সত্য ও সঠিক তথ্য প্রকাশ: সমাজে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, সমস্যা ও সম্ভাবনার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে সাংবাদিকতা। গুজব, অপতথ্য ও বিভ্রান্তি থেকে মানুষকে রক্ষা করতে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার বিকল্প নেই।
২. অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভূমিকাঃ দুর্নীতি,অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অনুসন্ধান করে জনসমক্ষে তুলে ধরার মাধ্যমে সাংবাদিকতা জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।
৩. জনসচেতনতা সৃষ্টি: শিক্ষা,স্বাস্থ্য,পরিবেশ,আইন,সামাজিক সমস্যা ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে সাংবাদিকতা। ফলে জনগণ নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে পারে।
৪. গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা: গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের মতামত, দাবি, সমালোচনা ও প্রত্যাশা তুলে ধরার অন্যতম মাধ্যম গণমাধ্যম। স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখে।
৫. অবহেলিত মানুষের কণ্ঠস্বর: সমাজের দরিদ্র, অসহায়, নির্যাতিত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সমস্যা ও দাবিগুলো তুলে ধরে সাংবাদিকতা। যাদের কথা অনেক সময় ক্ষমতাবানদের কাছে পৌঁছায় না, তাদের কথা সমাজ ও রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরাই সাংবাদিকতার অন্যতম মানবিক দায়িত্ব।
সাংবাদিকতা কি শুধু সংবাদ প্রকাশের পেশা?
না, সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়।এটি জনস্বার্থে কাজ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একজন প্রকৃত সাংবাদিক কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রভাব,অর্থনৈতিক সুবিধা কিংবা কোনো পক্ষের চাপে সত্যকে আড়াল করতে পারেন না। তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও জনস্বার্থ।
সাংবাদিকতার সঙ্গে যেমন স্বাধীনতা জড়িত,তেমনি এর সঙ্গে জড়িত দায়িত্বশীলতাও। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ,ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখা একজন পেশাদার সাংবাদিকের মৌলিক দায়িত্ব।বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ
প্রযুক্তির উন্নয়নে সাংবাদিকতার পরিধি অনেক বেড়েছে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে মুহূর্তেই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ছে।তবে এর পাশাপাশি বেড়েছে ভুয়া সংবাদ, অপতথ্য, গুজব, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা ও যাচাইহীন তথ্য প্রকাশের ঝুঁকি।
এ ছাড়া সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ, আর্থিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করাও বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ।এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন স্বাধীন, নিরপেক্ষ, নৈতিক ও পেশাদার সাংবাদিকতা। পাশাপাশি সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ, পেশাগত মর্যাদা,নিরাপত্তা এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
একজন আদর্শ সাংবাদিকের গুণাবলি
একজন আদর্শ সাংবাদিকের মধ্যে সততা, সাহসিকতা, নিরপেক্ষতা, দায়িত্ববোধ, অনুসন্ধানী মনোভাব এবং মানবিক মূল্যবোধ থাকা প্রয়োজন। তাঁকে হতে হবে তথ্যনির্ভর ও যুক্তিবাদী। কোনো সংবাদ প্রকাশের আগে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করা এবং ভুল হলে তা সংশোধন করার মানসিকতাও থাকতে হবে।সাংবাদিকের কলম হতে হবে সত্যের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং মানুষের কল্যাণে। তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করা অপরিহার্য।
উপসংহারঃ-
সাংবাদিকতা একটি সমাজের বিবেক ও রাষ্ট্রের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। যে সমাজে স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতা বিকশিত হয়,সে সমাজে অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি হওয়ার সুযোগ বাড়ে। জনগণ পায় সত্য জানার অধিকার, রাষ্ট্র পায় জবাবদিহির চাপ এবং সমাজ এগিয়ে যায় সচেতনতার পথে।তাই সাংবাদিকতাকে শুধু জীবিকা অর্জনের পেশা হিসেবে দেখলে চলবে না,একে দেখতে হবে সত্য অনুসন্ধান, মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং জনস্বার্থ রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে।
সাংবাদিকতার মূল শক্তি তার কলমে নয়,তার সত্যনিষ্ঠায়। কারণ, সংবাদ মানুষের কাছে পৌঁছানোই সাংবাদিকতার কাজ নয়; বরং মানুষকে সত্য জানতে সহায়তা করাই সাংবাদিকতার প্রকৃত সার্থকতা।
আপনার মতামত লিখুন