সমাজের অন্যায় ও পরিবর্তনের দায়িত্ব,আমরা কি সত্যিই বদলাতে চাই?
রফিকুল ইসলাম রফিক,সুনামগঞ্জ।
আমরা প্রতিনিয়ত একটি সুন্দর সমাজের স্বপ্ন দেখি। এমন একটি সমাজ, যেখানে থাকবে না অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা বৈষম্য। যেখানে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াবে,অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা অনেকেই পরিবর্তনের কথা বলি, অথচ নিজের অবস্থান থেকে পরিবর্তনের জন্য কতটুকু দায়িত্ব পালন করি, সেই প্রশ্ন খুব কমই করি।
সমাজে অন্যায়-অনিয়ম যেন দিন দিন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। কোথাও ক্ষমতার অপব্যবহার, কোথাও দুর্নীতি, কোথাও অসহায় মানুষের অধিকার হরণ। আবার কোথাও যোগ্য ব্যক্তি বঞ্চিত হচ্ছেন, আর প্রভাবশালীরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত। এসব ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এগুলো পুরো সমাজের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেক সময় আমরা অন্যায়ের শিকার হলেও প্রতিবাদ করতে চাই না। নিজের স্বার্থে আঘাত না লাগলে অন্যের কষ্টকে গুরুত্ব দিই না।কোথাও অনিয়ম দেখেও নীরব থাকি, কোথাও অন্যায়ের প্রতিবাদকারীকে সহযোগিতা না করে বরং নিরুৎসাহিত করি। এভাবে নীরবতা অন্যায়কে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
তবে সমাজের সব সমস্যার দায় শুধু রাষ্ট্র বা প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। রাষ্ট্রের যেমন নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি প্রত্যেক নাগরিকেরও কিছু নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব আছে। নিজের কাজ সৎভাবে করা, অন্যের অধিকার সম্মান করা, আইন মেনে চলা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতন অবস্থান নেওয়া - এসবের মধ্য দিয়েই ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
পরিবর্তন শুরু হতে পারে পরিবার থেকে।একটি শিশু পরিবার থেকেই সততা, নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষা পায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। আর সমাজের সচেতন মানুষ যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হন, তাহলে অনেক অনিয়ম প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি ও মানুষের বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরেন। তবে সাংবাদিকতার মূল শক্তি হতে হবে সত্য, নিরপেক্ষতা ও তথ্যের যথার্থতা। একইভাবে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, শিক্ষক, ব্যবসায়ীসহ সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করা জরুরি।
আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিবাদ মানেই বিশৃঙ্খলা নয়। সত্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা নাগরিকের নৈতিক অধিকার। তবে সেই প্রতিবাদ হতে হবে শান্তিপূর্ণ, যুক্তিনির্ভর ও আইনসম্মত। কাউকে অপমান বা হয়রানি করা নয়, বরং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।আমরা প্রায়ই বলি, দেশ বদলাতে হবে, সমাজ বদলাতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই পরিবর্তনের শুরুটা কে করবে? অন্য কেউ নয়, শুরু করতে হবে আমাদের নিজেদের থেকেই। আমি যদি নিজের দায়িত্বে অবহেলা করি, অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করি, অনিয়মকে প্রশ্রয় দিই, তাহলে শুধু অন্যের কাছে পরিবর্তন আশা করে লাভ কী?
একটি সুন্দর সমাজ গড়তে বড় বড় প্রতিশ্রুতির চেয়ে ছোট ছোট সৎ উদ্যোগ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আসুন, আমরা অন্যায়কে প্রশ্রয় না দিই, দুর্নীতিকে স্বাভাবিক মনে না করি, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই এবং নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করি।কারণ সমাজ পরিবর্তনের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, শুধু প্রশাসনের নয়, শুধু কোনো বিশেষ শ্রেণিরও নয়। এই দায়িত্ব আমাদের সবার।আমরা যদি সত্যিই পরিবর্তন চাই, তাহলে পরিবর্তনের অপেক্ষায় না থেকে নিজেরাই পরিবর্তনের অংশ হয়ে উঠতে হবে।
আপনার মতামত লিখুন